ডালহৌসি স্কোয়ার (বি.বা.দী বাগ)

কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে বিখ্যাত জায়গাগুলোর মধ্যে একটা হল এই ডালহৌসি চত্বর। সাধারনভাবে রাইটার্স বিল্ডিং লালদিঘী এবং তার আশেপাশের এলাকাই এই নাম হিসাবেই পরিচিত, এই জায়গার প্রত্যেকটি ভবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়ানো রয়েছে ইতিহাস। শুধু রাজনৈতিক ভাবে নয় একটা সময়ে অর্থনৈতিক ভাবে বিভিন্ন ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য বড়ো অফিসের কলকাতার মুখ্য অফিসের কেন্দ্র বৃহত্তর এই এলাকাটা। তাই সাধারনভাবে জায়গাটাকে অফিসপাড়া নামেও ডাকা হয়।

অফিসপাড়া, ডালহৌসি বা বিনয় বাদল দীনেশ বাগ; নাম যাই হোক না কেন, ঐতিহাসিক স্থাপত্যের সব নিদর্শন নিয়ে লাল দীঘির চারপাশ জুড়ে যে সব বিখ্যাত ভবনগুলো মাথা তুলে আছে তাদের ইতিহাসও সুদীর্ঘ।

১৮৪৭ থেকে ১৮৫৭ পর‍্যন্ত ব্রিটিশ ভারত তথা বাংলার গভর্নর লর্ড ডালহৌসির নামানুসারে জায়গাটির পুরনো নাম। জায়গাটিকে আসলে লন্ডনের বিখ্যাত ট্রাফালগার স্কোয়ারের আদলে বানাবার প্রচেস্টা হয়েছিল। তা যদিও কতদূর সফল হয়েছে তা বলা বাহুল্য। তবে উদাহরনস্বরুপ বলা যায় ট্রাফালগারের সেন্ট মার্টিন চার্চের আদলে কলকাতার প্রথম প্যাড়িশ চার্চ সেন্ট জনও কিন্তু এখানে অবস্থিত।
গোটা এলাকাটি ডালহৌসি স্কোয়ার হেরিটেজ জোন নামে খ্যাত। এখানে রয়েছে ৫০ এরও বেশী ভবন যার অনেকেই একশো বা দুশো বছরেরও পুরোনো। এগুলো কলকাতা করপোরেশন হেরিটেজ ভবন হিসাবে চিহ্নিত করেছে এবং রেট্রোফিটিং এর কাজ চলছে এখানে।

এলাকার মধ্যমনি হল রাইটার্স বিল্ডিং বা মহাকরন। ব্রিটিশ যুগ থেকে বাংলার ক্ষমতার অলিন্দ হিসাবে পরিচিত, স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে বিনয় বাদল দীনেশ, অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং বিল ব্রিটিশ ভারতে পাশ হবার সাক্ষী থেকে শুরু করে স্বাধীন ভারতেও অনেক রাজনৈতিক বিপ্লব ও ক্ষমতার হস্তান্তরের পটভূমির সাক্ষী এই ভবনটি। আগে ব্রিটিশ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি এবং তারপর স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের সরকারের মূখ্য কার‍্যালয় হিসাবে কাজ করেছে মহাকরন। নবান্নে ক্ষমতার কেন্দ্র বদলের আগে অব্দি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার অলিন্দ ছিল মহাকরন। তবে মহাকরনের আধুনিকায়নের কাজ চলছে এখন। আশা করা যায় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার ভারকেন্দ্র আবার এখানে ফিরে আসবে।

মহাকরনের সামনের দিকে আছে সুসজ্জিত পার্ক যাতে রয়েছে স্বাধীন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রি ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের মূর্তি এবং বিনয় বাদল দীনেশের মূর্তি। এই তিনজন বিপ্লবী যারা ব্রিটিশ আমলে মহাকরন অভিযান চালিয়ে দুঃসাহসিক ভাবে ব্রিটিশদের ভারত ছাড়ার ব্যবস্থায় অংশ নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামী হয়েছিলেন মহাকরনের ভেতরে ‘অলিন্দ যুদ্ধে’ হত হয়ে।
সামনের লালদীঘি, মহাকরনের সামনে বিখ্যাত দীঘি সংস্কারের অভাব বোধ করে। এর চেয়েও সুন্দরভাবে সাজানো যায় এই ঐতিহাসিক জায়গাটিকে মনে হয়।

মহাকরন ও তার আশেপাশের শতাব্দীপ্রাচীন অফিস বাড়িগুলো, ব্যাঙ্ক পোস্ট অফিস এদের হেড অফিস ও বিভিন্ন রাজ্য ও জাতীয় দপ্তরের অফিসগুলো প্রত্যেকটি এক একটা ইতিহাসের গল্প বলে। না জানি কত গল্প জুড়ে এদের সাথে, কত লোক কত দূর থেকে এসেছেন এখানে, তাদের জীবনের কত গল্প এখানে। ইতিহাস যদি কলকাতায় জীবন্ত হয় তা সে ডালহৌসি তেই এবং সেটা গর্ব করার ইতিহাস। বঙ্গভঙ্গের পর পঞ্চম জর্জ এসে দিল্লীতে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর কলকাতা আর সেভাবে ব্রিটিশ নজর পায়নি। নয়তো একটা সুদীর্ঘ সময় শুধু ভারতের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর নয়, গোটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে, লন্ডনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ছিল তিলোত্তমা। তিলোত্তমার সেই গৌরবময় ইতিহাস মনে রাখাটা খুব জরুরি। কারন যে জাতি নিজের গৌরবের ইতিহাস, রেনেসাঁর ইতিহাস, আধুনিকতার ইতিহাস, স্থাপত্যের ইতিহাস, সভ্যতার ইতিহাস বিস্মৃত হয়, সেই জাতির পতন অনিবার্য।


কলকাতার এই অফিসপাড়া নামে খ্যাত ডালহৌসি স্কোয়ার, যুগ যুগ ধরে প্রচুর মানুষকে টেনে এনেছে অফিসের দরকারি কাজে৷ আর সেই কাজের সাথে আসা মানুষের ক্ষিদে মেটাতে মহাকরনের পেছনের দিকের রাস্তা ধরে রয়েছে রকমারি খাবার। বিভিন্ন ধরনের, সব ধরনের মানুষের স্ট্রিট ফুডের চাহিদা যুগ যুগ ধরে মিটিয়ে কলকাতার অন্যতম স্ট্রিট ফুড হাব হয়ে দাড়িয়েছে ডালহৌসি স্কোয়ার বা অফিসপাড়া। অফিসপাড়ার সেই খাদ্য অভিযান পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s